চামড়ার ন্যায্যা মূল্য না পাওয়া চাটখিলে রাস্তার পাশে ফেলিয়ে রাখছেন কোরবানদাতারা

জি এম শাকিল ;গবাদি পশুর চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল আজহা। অন্যান্য বছর এ সময়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততার কমতি ছিল না। আসন্ন ঈদে পশুর চামড়া সংগ্রহে ট্যানারিগুলো প্রস্তুতি নিতে থাকে। এবারে চিরচেনা সে চিত্র নেই। করোনার আঘাতে বাণিজ্যিক সব ব্যস্ততাই যেন থেমে গেছে।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্ববাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় গত কয়েক মাসে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির বেশির ভাগ পুরনো অর্ডার বাতিল হয়েছে। নতুন অর্ডার নেই বললেই চলে। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর ট্যানারিগুলোতে এখনো গত বছরে ঈদুল আজহায় সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া পড়ে আছে। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় ট্যানারির মালিকরা অর্থসংকটে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন চামড়া সংগ্রহ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

চাটখিলের বাসিন্দা মাঈন উদ্দিন ১ লাখ দুই হাজার টাকার গরু দিয়ে কোরবানি দিয়েছেন। এলাকার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী গরুটির চামড়া একশো টাকায় দরদাম করে। আরেকটু বেশি দামে বিক্রির আশায় ওই ব্যবসায়ীর কাছে চামড়া বিক্রি না করায় পরবর্তীতে আর কোন ক্রেতা আসেনি। ফলে বাধ্য হয়ে গরুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন তিনি।

মাঈন উদ্দিনের মতো অন্তত ৫০ ভাগ কোরবানীদাতা গরুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে গরু, ছাগল মহিষ সহ অন্যান্য পশুর চামড়া শেষ পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। অন্যরা ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করেছেন কোরবানির পশুর চামড়া।

মাঈন উদ্দিন দৈনিক চাটখিলবার্তা বলেন, এক সময় ২০ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানি করা গরুর চামড়া বিক্রি হতো প্রায় ১২০০ টাকা। এর এখন লাখ টাকার উপরে কেনা গরুর চামড়া ১০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছেনা।

আবার অনেকেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে বিভিন্ন দাতব্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং মসজিদে চামড়া দান করেছেন। এই চামড়া নিয়েও রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন চামড়া গ্রহণ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে বাধ্য হয়েই তারা চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে চামড়া তুলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় এবং শ্রমিকের মজুরীর টাকাও ফেরত পাবেন কিনা তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় এ প্রতিষ্ঠানগুলো।

চট্টগ্রামের দারুল উলুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ শোয়াইব দৈনিক চাটখিলবার্তা কে বলেন, এবারের কোরবানীর ঈদে ২৭৯ টি গরু, ৪০ টি মহিষ এবং ৮ টি ছাগলের চামড়া দান করেছেন এলাকাবাসী। এগুলো নিয়ে আমরা রীতিমতো বিপাকে পড়ে যাই। স্থানীয়ভাবে ক্রেতা না আসায় পরবর্তীতে শ্রমিক দিয়ে পাশ্ববর্তী বাজারে নিয়ে যাই বিক্রি করতে। শনিবার রাত পর্যন্তও কোন ক্রেতা পাচ্ছিলামনা। পরবর্তীতে বিক্রি হওয়া স্বাপেক্ষে টাকা দেওয়ার শর্তে একজন ব্যবসায়ীকে চামড়া গুলো দিয়ে দিয়েছি। বাজারে এ সময় প্রতিটি চামড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করছিলো মৌসুমী চামড়া সংগ্রহকারীরা।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক নির্বাহী সদস্য শাহ আলম বলেন, প্রতি বছর আমি ৩ থেকে ৪ হাজার চামড়া ক্রয় করতাম। গরুর চামড়া প্রতিটি দুইশ টাকার মধ্যে এবার মাত্র ১ হাজার চামড়া ক্রয় করেছি। অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী রবিবারও চামড়া নিয়ে আসছেন। চামড়া ক্রয়ে অপরাগতা প্রকাশ করার পরও তারা বলছে টাকা পরে দিলেও চলবে। না হয় চামড়া ফেলে দেওয়া ছাড়া তাদের উপায় থাকবেনা।

চট্টগ্রাম মহানগরী সহ বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর চামড়ার দাম না পেয়ে লক্ষাধিক চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনায় এবার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানী দাতাদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেননি।

চট্টগ্রাম নগরী এবং বিভিন্ন উপজেলার চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করে সেগুলো আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থিত আড়তদার ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে আসে। সেখানে লবন দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে সরবরাহ করে আড়তদাররা।

চট্টগ্রামে সমিতিভুক্ত আড়তদার রয়েছে ১১২ জন। সমিতির সদস্য নয় এমন আড়তার আছে আরো অন্তত ১৫০ জন।

এ বছর ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ২৮ থেকে ৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবার সেটি ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, আমরা চামড়া ক্রয় করছি। কী পরিমান চামড়া ক্রয় করা হয়েছে তা জানতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার চামড়া ক্রয়ের পরিমাণ কম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

Developed by : M. Masud Alam